২১ নভেম্বর, ২০১৯ || ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

শিরোনাম
  বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা        আজ শোকাবহ জেল হত্যা দিবস     
২০৩

প্রথম স্বাধীনতা দিবসে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিয়েছিলেন

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০১৯  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পুরোনো ছবি

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পুরোনো ছবি

আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। দেশ স্বাধীনের পর প্রথম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে বেতার ও টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দিয়েছিলেন বিডিপ্রজন্ম৭১-এর পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো-

‘আমরা আজ স্বাধীনতার প্রথম বর্ষপূতি উৎসব পালন করিতেছি। এই মহান দিনে স্বাধীনতা অর্জনের পথে যে লক্ষ লক্ষ বীর শহীদ হইয়াছেন, তাহাদের জন্য গভীর বেদনাপ্লুত মনে আমার শোকাতুর দেশবাসীর সতিহ পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার দরবারে মাগফেরাত কামনা করিতেছি। সেই সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামে গৌরব উজ্জ্বল ও অনন্য ভূমিকা পালনের জন্য আমি মুক্তিবাহিনীর সকল অঙ্গদল তথা বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিক সদস্যবৃন্দ, নির্ভীক যুবক, ছাত্র-কৃষক, মজদুর-বুদ্ধিজীবী আর আমার সংগ্রামী জনসাধারণকে অভিনন্দন জানাইতেছি। তাহাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা ও একনিষ্ঠ আত্মদান অনাগতকালের ভাবী বাঙালিদের জন্য প্রেরণার উৎস হইয়া থাকিবে। আমাদের মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিকতা ও সম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত মুক্তিপাগল জনতার চেতনাকে উদ্ভাসিত করিবে।

বিগত পঁচিশ বৎসব যাবৎ আপনারা ক্ষুধা, বঞ্চনা, অশিক্ষা এবং মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করিতেছেন। সাম্রাজ্যবাদী শোষকেরা আমাদের প্রিয় মার্তৃভূমিকে একটি নিকৃষ্টতম উপনিবেশে পরিণত করিয়াছিল। দুঃসহ ও ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে আমরা দিনযাপন করিতেছিলাম। পিষ্ট হইতেছিলাম শোষণের জগদ্দল পাথরের নিচে চাপা পড়িয়া। দারিদ্র্যের ও অনাহারের বিষবাষ্পে যখন আমরা আকণ্ঠনিমজ্জিত, তখন তদানীন্তন পাকিস্তানী শাসকরা আমাদের কাষ্টার্জিত তিন হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুণ্ঠন করিয়া তাহাদের পশ্চিম পাকিস্তানকে গড়িয়া তোলার কাজে মত্ত ছিল। ন্যায়বিচার দাবি করায় মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শ আমাদের উপর নামিয়া আসে। সমসাময়িক কালে নিষ্ঠুরতম স্বাধীনতাযুদ্ধে আমাদের ত্রিশ লক্ষ লোক প্রাণ দিয়েছে, আর তিন কোটি মানুষ সর্বস্বান্ত হইয়য়াছে। এই সবকিছুই ঘটিয়াছে আমাদের স্বাধীনতার জন্য। আজ আমি যখন আমার সোনর বাংলার দিকে তাকাই, তখন দেখিতে পাই যুদ্ধবিধ্বস্ত ধূসর পান্ডুর জমি, ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রাম, ক্ষুধার্ত শিশু, বিবস্ত্র নারী আর হতাশাগস্ত পুরুষ। আমি শুনিতে পাই সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ, নির্যাতিত নারীর ক্রন্দন ও পঙ্গ মুক্তিযোদ্ধার ফরিয়াদ। আমাদের স্বাধীনতা যদি ইহাদের আশা-নিরাশার দ্বন্দ হইতে উদ্ধার করিয়া মুখে হাসি ফুটাইতে না পারে, লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্ত শিশুর মুখে তুলিয়া না দিতে পারে এক মুষ্টি অন্ন, মুছিয়া দিতে না পারে মায়ের অশ্রু ও বোনের বেদনা, তাহা হইলে সে স্বাধীনতা মিথ্যা, সে আত্মত্যাগ বৃথা। আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতার বর্ষপূর্তি উৎসবের লগ্নে দাঁড়াইয়া আসুন, আজ আমরা এই শপথ গ্রহণ করি, বিধস্ত মুক্ত বাংলাদেশকে আমরা গড়িয়া তুলিব। গুটি কয়েক সুবিধাবাদী নয়, সাড়ে সাত কোটি মানুষ তার সুফল ভোগ করিবে। আমি ভবিষৎ বংশধরদের সুখী ও উন্নততর জীবনের প্রতিশ্রুতি দিতেছি।

আজ আমাদের সামনে পর্বতসমান সমস্যা উপস্থিত। আজ মহাসঙ্কটের ক্রান্তিলগ্নে আমরা উপস্থিত হইয়াছি। বিদেশ ফেরত এক কোটি উদ্বাস্তু, স্বদেশের বুকে দুই কোটি গৃহহারা মানুষ, বিক্ষত কর্মহীন চালনা-চট্টগ্রাম পোতাশ্রয়, নিশ্চল কারখানা, নির্বাপিত বিদ্যুৎ সরবরাহ, অসংখ্য বেকার, অপরিমিত অরাজকতা, বিশৃঙ্খল বাণিজ্যিক সরবরাহ ব্যবস্থা, ভগ্ন সড়ক, সেতু ও বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা, দারিদ্র, খাদ্যাভাব, দ্রবমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং অকষিত ভূমি- এ সবকিছুই আমরা উত্তরাধিকারসূত্রে পাইয়াছি। জনগণের গভীর ভালোবাসা, আস্থা, অদম্য সাহস ও অতুলনীয় ঐক্য- এগুলিকে সম্বল করিয়া আমার সরকার এই সঙ্কট কাটাইয়া উঠার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করিয়াছে। আমি আশা করি, অতীতে আপনারা যেইভাবে দুর্জয় সাহসে বুক বাধিয়া ইয়াহিয়ার সামরিক অস্ত্রকে পরাভূত কারিয়াছিলেন, গভীর প্রত্যয় ও সাহস নিয়া, তেমনই বর্তমান সঙ্কটের মোকাবিলা করিবেন। আমরা পুরাতন আমলের জীর্ণ ধ্বংসস্তুপের মধ্য হইতে নূতন সমাজ গড়িয়া তুলিব।

ভাই ও বোনেরা আপনার জানেন হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের বাংলাদেশ রাইফেল ও পুলিশের বিপুলসংখক সদস্যকে হত্যা করিয়াছে। আইনের শাসন কায়েক ও শান্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠনের অভাব বিপ্লবী বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটা বিরাট সমস্যা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। তখন নিযুক্তির মাধ্যমে আমরা পুলিশ বিভাগকে সংগঠিত কারিয়াছি এবং ইতোমধ্যে যে সকল সমাজবিরোধী দুস্কৃতিকারী স্বাধীনতা-উত্তর সুযোগ সুবিধাদির অপব্যবহারে লিপ্ত হইয়াছিল, তাহাদের দমন করিয়া জনসাধারণের মনে নিরাপত্তাবোধ ফিরাইয়া আনার কাজে হাত দেওয়া হইয়াছে। উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা পাইয়াছিলাম স্বাধীন জাতির জন্য সম্পূর্ণ অনুপযোগী একটি প্রাদেশিক প্রশাসনিক কাঠামো। ইহার কিছু কিছু আমর  ঔপনিবেশিক মানসিকতা কাটাইয়া উঠিতে পারিতেছিল না। তাহারা এখনও বনেদী আমলাতান্ত্রিক মনোভাবকে প্রশ্রয় দিয়া চলিয়াছে। আমরা তাহাদেরকে স্বাধীন জাতীয় সরকারের অর্থ অনুধাবনের জন্য উপদেশ দিতেছি। এবং আশা করিতেছি, তাঁহাদের পশ্চাদমুখী দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন ঘটিবে। আমরা সরকার নব রাষ্ট্র এবং নূতন সমাজের উপযোগী কারিয় সমগ্র প্রশাসনিক যন্ত্রকে পুনর্গঠিত করিবে। প্রস্তাবিত প্রশাসনিক কাঠামোতে জনগণ ও সরকারি কর্মাচারীদের মধ্যে নৈকট্য সৃষ্টির পূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হইতেছে। আমরা বাংলাদেশের সমস্ত মহকুমাগুলিকে জেলা পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা তৈরি করিতেছি।

বিশষজ্ঞরা খসড়া শাসনন্ত্র প্রণয়নের কাজে নিয়োজিত রহিয়াছেন। তাহাদের কাজ অনেকটা অগ্রসক হইয়াছে এবং খসড়া শাসনতন্ত্র গণপরিষদের পূর্বেরই প্রস্তুত হইয়া যাইবে। এই শাসনতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হইবে- জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজবাদ ও ধর্মনিরেপক্ষতা। ৫৪টি বন্ধুরাষ্ট্র  এ পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিপুলসংখ্যক বন্ধুরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতিদান রাষ্ট্রপুঞ্জের অন্যান্য সদস্যকে বাংলাদেশের বাস্তবতাকে মানিয়া নেয়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করিবে।

উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন ও অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য আমরা বন্ধুরাষ্ট্রগুলির নিকট হইতে উদার সাহায্য ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করিতেছি। বিশেষ করিয়া ভারত আমাদের সুদিন ও দুর্দিনের প্রতিবেশী। সম্প্রতি মহান ভারতের মহান নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফর করিয়া গিয়াছেন। এই শুভেচ্ছা সফরের প্রাক্কালে আমরা শান্তি, বন্ধুত্ব ও মৈত্রী চুক্তিতে সংহতির বন্ধনকে মজবুত করিবে। সোভিয়েত রাশিয়া আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের দুর্যোগময় মুহূর্তে পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। আমি সোভিয়েত রাশিয়া সফর করিয়া আসিয়াছি, সেখানে তাহাদের অকৃত্রিম আতিথেয়তা আমামে মুদ্ধ করিয়াছে। সোভিয়েত নেতৃবর্গ বিদ্ধস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের কাজে সার্বিক সাহায্যের আশ্বাস দিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে আমি পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রপুঞ্জ যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলি এবং অন্য বন্ধুরাষ্ট্রসমূহ যাহারা আমাদের দিকে সাহায্যের হাত নিয়া আগাইয়া আসিয়াছেন তাহাদের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করিতেছি। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি জোট বহির্ভূত ও সক্রিয় নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রচিত। বৃহ-শক্তির আন্তর্জাতিক সংঘাতের বাহিরে আমরা শান্তিকামী। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নীতিতে বিশ্বাসী এবং প্রতিবেশীর সহিত সদ্ভাব সৃষ্টিতে আগ্রহী। দেশ গড়ার কাজে কেহ আমাদের সাহায্য করিতে চাহিলে তাহা আমরা গ্রহণ করিব। কিন্তু সে সাহায্য অবশ্যই হইতে হইবে নিষ্কণ্টক ও শর্তহীন। আমরা জাতীয় সার্বভৌম ও সমস্ত জাতির সম-মর্যাদার নীতিতে আস্থাশীল। আমাদের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে কেহ হস্তক্ষেপ করিবেন না, ইহাই আমাদের কামনা।

দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তানের শাসকরা বাংলাদেশের বাস্তবতাকে স্বীকৃতি প্রদান করিতেছে না। তাহারা পাঁচ লক্ষ নিরীহ বাঙালিকে সন্ত্রাস ও দুর্দশার মধ্যে আটক রাখিয়াছে। আমি বিশ্বের বিবেকসম্পন্ন মানুষ ও বিশেষ করিয়া মি. ভুট্টোর নিকট আবেদন করিতেছি, তাহাদের ফিরাইয়া দেওয়া হোক। এই ইস্যুকে কোন ক্রমেই যুদ্ধবন্দিদের সহিত সমপর্যায়ে গণ্য করা চলিবে না। কারণ, যুদ্ধবন্দিদের মধ্যে এমন অনেক আছে- যাহারা শতাব্দীর নৃশংসতম হত্যার অপরাধে অপরাধী। তাহারা মানবিকতাকে লঙ্ঘন করিয়াছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার ভিত্তিতে তাহাদের বিচার হইতে হইবে। পাকিস্তানের সংবেদনশীল সাধারণ মানুষের নিকট আমার আবেদন, নুরেমবার্গ মামলার আসামিদের হইতেও নিকৃষ্ট ধরণের এই অপরাধীদেরকে যেন তাহারা স্বজাতি বলিয়া ভাবিবেন না।

যাহারা উদ্বাস্তু হইয়া ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহারা দেশে প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন। সাহায্য, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য আমরা কার্যকরী কর্মসূচি গ্রহন করিয়াছি। বিনামূল্যে ও ন্যায্যমূল্যে খাদ্য সরবরাহের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে। ছিন্নমূল মানুষের মাথা গুজিবার ঠাঁই করিয়া দেয়ার জন্য অস্থায়ী বাসগৃহ তৈরির কাজ হতে নেয়া হইয়াছে।

বিধবা, অনাথ এবং নির্যাতিত মহিলাদের পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে সরকার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করিতেছেন। হানাদার পাকিস্তান বাহিনী যেভাবে বাংলাদেশকে ধ্বংস করিয়াছে, তাহাতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থা পুনরুদ্ধার করিতে দশ বৎসব সময় দরকার। আমাদের বিপ্লবী সরকার তিন বৎসরের মধ্যেই এই কাজ সমাপ্ত করিতে চান।

আমার সরকার অভ্যন্তরীণ সমাজ বিপ্লবে বিশ্বাসী। পুরাতন সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন করিতে হইবে। অবাস্তব তালিকা নয়, আমার সরকার ও পার্টি বৈজ্ঞানিক সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রবর্তনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দেশের বাস্তবিক প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে পুরাতন সমাজিক কাঠামোকে ভাঙ্গিয়া নূতন সমাজ গড়িতে হইবে। শোষণ ও অবিচারমুক্ত নূতন সমাজ আমরা গড়িয়া তুলিব এবং জাতির এই মাহক্রান্তিলগ্নে সম্পদের সমাজিকীকরণের পর্যায়ক্রমিক কর্মসূচির শুভ সূচনা হিসেবে আমার সরকার নিম্ন লিখিত বিষয়গুলি জাতীয়করণ করিতেছে-

১. ব্যাংকসমূহ (বিদেশি ব্যাংকের শাখাগুলি ভিন্ন)
২. সাধারণ ও জীবন বীমা কোম্পানিসমূহ ( বিদেশি বীমা কোম্পানির শাখাসমূহ ভিন্ন)।
৩. সকল পাটকল।
৪. সকল বস্ত্র ও সূতাকল।
৫. সকল চিনিকল।
৬. আভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌ-যানের বৃহদাংশ।
৭ ১৫ লক্ষ টাকা মূল্যের ও তদূর্ধ্ব সকল পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকানাভুক্ত সম্পত্তি।
৮. বাংলাদেশ বিমান ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনকে সরকারি সংস্থা হিসেবে স্থাপন করা হইয়াছে।
৯. সমগ্র বহির্বাণিজ্যকে রাষ্ট্রীয়করণের লক্ষ্য নিয়া সাময়িকভাবে বহির্বাণিজ্যের বৃহদাংশকে এই মুহূর্তে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে আনা হইয়াছে।

দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি প্রতিভাবান ব্যক্তিদের আমি দেশগড়ার কাজে আগাইয়া আসার জন্য আমন্ত্রণ জানাইতেছি। সরকারি সেক্টরে কাজ করার জন্য তাহাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হইবে। শিগগিরই যে শিল্পনীতি ঘোষণা করা হইবে, তাহাতে এইসব ব্যবস্থা সম্পর্কে বলা হইবে।

যেই সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানের সহিত বাঙালিদের মালিকানার স্বার্থ সরাসরি জড়িত, সেই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের সাবেক মালিক অথবা প্রধান কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানাইতেছি যে, তাহারা যেন অবশ্যই স্মরণ রাখবে, আমরা যে- সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেছি, সেইগুলি সবদিক হইতে বিপ্লবাত্মক এবং জনসাধারণকে অবশ্যই এইসব ক্ষেত্রে তাহাদের দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে।

বেসরকারি ক্ষেত্রে মাঝারি ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিকে আমাদের নীতির সুনির্দিষ্ট ভূমিকা রহিয়াছে। এইসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সরকারি নীতির কাঠামোর মধ্যে হইতে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের কাজ ন্যায্যভাবে চালানোর জন্য উৎসাহ দেওয়া হইবে।

বিপুল খাদ্য ঘাটতি আমাদের জন্য এক দুঃসহ অভিশাপ। কিন্তু আমি কাউকে না খাইয়া মরিতে দিতে চাহি না। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে আমি দশ লক্ষ টন খাদ্যশস্য বিদেশ হইতে আনার চেষ্টা করিব এবং ডিসেম্বরের মধ্যে আরো বিশ লক্ষ টন আমদানি করার ব্যবস্থা করা হইতেছে। সামনের কয়েক সপ্তাহ আমাদের জন্য ঘোর দুর্দিন।

আমার প্রাণপ্রিয় দেশবাসী- আপনারা ধৈর্যধারণ করুন। উচ্চতম অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে খাদ্য ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হইবে। এ প্রসঙ্গে আমি মজুতদার, চোরাকারবারী ও গুজব বিলাসীদের হুঁশিয়ার করিয়া দিতেছি। তাহারা যেন নিরন্ন মানুষের মুখের রুটি নিয়া ছিনিমিনি না খেলে-তাহদের কঠোর হস্তে দমন করা হইবে।

শ্রমিক ভাইদের আমি বলি- শ্রম ও পুঁজির মধ্যে আবহমানকাল ধরিয়া যেই পরস্পর বিরোধিতা রহিয়াছে তা আমাদের নূতন নীতি গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ হইতে অনেকখানি বিলুপ্ত হইবে। শ্রমিক- কর্মচারীকে আর সর্বদা মালিকের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত থাকিতে হইবে না। কেননা, বর্তমানে তাহাদের মালিক হইবে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ, যাহারা মালিক ও ম্যানেজারদের হাতে বিশ্বাস করিয়া নিজেদের সম্পত্তি জমা রাখিয়াছে।

আমি খুব শীঘ্রই শ্রমিক প্রতিনিধিদের একটি সভা করিতেছি। সেই সভায় শ্রমিক সংক্রান্ত সরকারি নীতি এবং আমাদের বিপ্লবী নীতিসমূহ বাস্তবায়িত করিতে তাহাদের যে পূর্ণ সহযোগিতা লাগিবে সে বিষয়ে আলোচনা করা হইবে। এই ব্যাপারে পূর্ণ মতৈক্য পৌঁছানোর পরে আমি আশা করিব যে, শ্রমিক নেতারা আমার সরকার ও আমার সঙ্গে একযোগে কাজ করিবেন এবং এই বিপ্লবী নীতিসমূহ সরাসরি শিল্প এলাকায় কার্যকরী করিবেন। তদুপরি শ্রমিকদের গুরুদায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষিত করিয়া গড়িয়া তুলিতে হইবে।

ছাত্র ভাইয়েরা শোন- আমার ছাত্র ভাইয়েরা যাহারা মুক্তিসংগ্রামে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়াছিল, তাহাদের প্রতি আমি আহ্বান জানাইতেছি যে তাহারা যেন আমাদের বিপ্লবের লক্ষ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য তাহাদের কাজ করিয়া যাইতে থাকে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লব সাধনের উদ্দেশ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশসহ আমি একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করিতে চলিয়াছি।

সূত্র : ইত্তেফাক, সোমনার, ২৭মার্চ ১৯৭২। এই দেশ এই মাটি, প্রবন্ধ, বক্তৃতা, বাণী, নির্দেশ ও সাক্ষাৎকার : সম্পাদনা আবুল মাল আবদুল মুহিত, আ আ স ম আরেফিন সিদ্দিক, মো. জাহিদ হোসেন।

মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত