৩১ অক্টোবর, ২০২০ || ১৫ কার্তিক ১৪২৭

শিরোনাম
  বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ‘টেকসই ভবিষ্যৎ’ নিশ্চিতের আহ্বান প্রধানমন্ত্রী        অবশেষে হাসপাতাল ছাড়লেন ইউএনও ওয়াহিদা        অবশেষে হাসপাতাল ছাড়লেন ইউএনও ওয়াহিদা     
৪৬১

বুকে বুলেট নিয়ে সিরাজুলের ৪৭ বছর, চান মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি

প্রকাশিত: ৭ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ৭ জানুয়ারি ২০১৯

রংপুর প্রতিনিধি

দীর্ঘ ৪৭ বছর ধরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বাহিনীর বুলেট শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন রংপুরের মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম বাদশা। ৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মুক্তিযোদ্ধা জীবন সায়াহ্নে এসে ডায়াবেটিক, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন। জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান।

আজ সোমবার দুপুরে রমেক হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের ৩৫ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার এই শেষ আকুতিটুকু এভাবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম।

স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ১৯৬৭ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন সিরাজুল ইসলাম। ১৯৭১ সালে খুলনার খালিশপুর ক্যাম্পে কর্মরত অবস্থায় দেশে যুদ্ধের দামামা বাজলে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণে উজ্জ্বীবিত হয়ে অন্য পুলিশ সদস্যদের মতো তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।

খুলনা থেকে কখনো পায়ে হেঁটে, আবার কখনো ট্রেনে নিজ বাড়ি গাইবান্ধার সদর উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের বিষ্ণপুর গ্রামে যাতায়াত করতেন সিরাজুল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে চলাকালীন সেখানে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে পাড়ি জমান ভারতে। সেখান থেকে ট্রেনিং নিয়ে ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন তিনি। তৎকালীন মুক্তি-সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়া সেনানীদের মতো তারও রয়েছে ব্যাচ নম্বর ৪১৭৬০, মুক্তিবার্তা নম্বর ০৩১৭০১০১৬০ এবং গেজেট নম্বর ৪৮। জাতীয় তালিকা ৪১ নম্বর, ১৯৭১।

১৯৭১ সালের সেই দিনগুলির কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘১৯৭১ সালের ডিসেম্ব প্রথম সপ্তাহে গাইবান্ধার পলাশবাড়ির বেতকাপা ইউনিয়নে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আমরা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেই। ওই যুদ্ধে সহযোদ্ধা ফরহাদ আলীর ছেলে গোলাম রব্বানীসহ আমাদের পাঁচজন শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনীরও বেশ কয়েকজন মারা যায় আমাদের তীব্র গোলাগুলিতে। ওই সম্মুখযুদ্ধে আমার বুকের বাম পাশে পাকিস্তানি বাহিনীর ছোড়া এলএমজির একটি গুলি ঢুকে যায়। এরপর দ্রুততার সাথে ভারতে শিলিগুড়ির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আমাকে। প্রায় তিন মাস চিকিৎসার পর দেশে ফিরে আসি। কিন্তু বুকের ভেতরে বুলেট তখন থেকেই যায়।’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘স্বাধীনতার পর কিছুটা সুস্থ হয়ে আবার পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেই। ১৯৯৬ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বুলেটটা আর বের করা হয়নি। ঘাতকের ছোড়া বুলেট নিয়ে বেঁচে থাকলেও পাইনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি। তাই জীবনের এই শেষ সময়ে আমি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়েই মরতে চাই।’

আবেগতাড়িত হয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনবাঁজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীন দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করেছেন। মূল্যায়নের ফল স্বরূপ প্রতিমাসে ১০ হাজার টাকা করে ভাতা পাই। কিন্তু এই টাকা চিকিৎসার পেছনেই আমার খরচ হয়ে যায়। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলে হয়ত ভাতাটা একটু বাড়ত। এতে কিছুটা হলেও চিকিৎসা খরচ চালিয়ে যেতে পারতাম।’

সিরাজুল ইসলামের একমাত্র ছেলে রফিকুল ইসলামও তার বাবার মতো যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দাবি করেন। তিনি তার বাবাকে দেওয়া বর্তমান সরকারের মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়নের কথা স্বগৌরবে স্বরণ করেন। তিনি বলেন, ‘বাবা যেহেতু একজন যুদ্ধাহত। তাই তার বিষয়টি সরকার বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

রমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. অজয় রায় মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ‘তার বুকে একটি বুলেট রয়েছে। দেহে বুলেট নিয়ে অনেকে বেঁচে থাকার নজির রয়েছে। কিন্তু বার্ধক্যের কারণে বর্তমানে তিনি কিডনি, শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছেন। তবে তার চিকিৎসার কোনো ক্রুটি হচ্ছে না।’

মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত