২১ নভেম্বর, ২০১৯ || ৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬

শিরোনাম
  বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা        আজ শোকাবহ জেল হত্যা দিবস     
১৫৬

‘১০-১৫ জন নিহত নারীদের সঙ্গে শিশুটিকেও জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে আসি’

ডেইলি বাংলাদেশ

প্রকাশিত: ২৭ মার্চ ২০১৯  

মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ

মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ

চার ভাই আর এক বোনের মধ্যে দ্বিতীয় মুক্তিযোদ্ধা মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ। যুদ্ধের সময় তিনি এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেই সিদ্ধান্ত নেই, যদি যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে যুদ্ধে যাবই যাব ইনশাআল্লাহ।

মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে এভাবেই সেসব স্মৃতিচারণ তুলে ধরেন মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতে যখন পাক হানাদার বাহিনী ঢাকা চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরগুলোতে পৈশাচিক গণহত্যা চালায় তখন এই অত্যাচার নির্যাতন থেকে বাদ ছিল না কুমিল্লাও। যেহেতু কুমিল্লায় সেনানিবাস আছে সেহেতু আমাদের আগেই ধারণা ছিল যুদ্ধ শুরু হলে প্রথমেই কুমিল্লা আক্রান্ত হতে পারে। ওই দিন সন্ধ্যার পরই সারা শহরে কানাঘুষা চলছে কি হয়, কি হবে। আমি, আমার বন্ধু ইউছুফ, পরীক্ষার্থী মনির হোসেন, সফিকুল ইসলাম ও এমপি মালেক সাহেবের এক ভাতিজাসহ কয়েকজন বন্ধু কুমিল্লা রেইসকোর্সে আড্ডা দিচ্ছিলাম।’

নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘এমন সময় নেতাদের কাছ থেকে খবর এল রাতে পাকসেনারা সেনানিবাস থেকে এসে কুমিল্লা শহরে আক্রমণ করবে। যেভাবেই হোক আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। তখন আমাদের যারা নেতা ছিলেন তারা হলেন- অধ্যক্ষ আফজল খান অ্যাডভোকেট, নাজমুল হাসান পাখি, অধ্যক্ষ আবদুর রউফ, আবদুর রশিদসহ আরো অনেকে। আমরা বাসস্ট্যান্ড রেলগেটে অবস্থান নেই। নেতাদের নির্দেশে কেউ টমছম ব্রিজসহ বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়। সময়টা সঠিক বলতে পারছি না। তবে রাত ১১টার পর লক্ষ্য করলাম সারা শহরেই পাক সেনাদের প্রতিরোধের জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ছাত্ররাও রাস্তায় নেমে পড়ছে। আর শহরে কিছুক্ষণ পরপর নানা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এক ধরনের ভয়ও কাছ করছে সবার মাঝে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তখন কুমিল্লা শহরে প্রবশ করার ভাল রাস্তা বলতে ছিল শাসনগাছা। সোর্সের মাধ্যমে পাকিস্তানি আর্মিরা আগেই জানতে পারে শাসনগাছায় যে আমাদের অবস্থান। আমরা কোনো কিছু বুঝার আগেই পাকিস্থান আর্মিরা শাসনগাছা এসেই এলোপাতাড়ি গুলি শুরু করে। তখন মুহূর্তেই আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। নেতাদের থেকে আমরা কর্মীরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। যে যেদিকে পারছে ভয়ে পালাচ্ছে। আর এ সুযোগে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো শহর নিয়ন্ত্রণে চলে যায় পাকিস্থানি বাহিনীর হাতে। তারা শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই আক্রমণ করে কুমিল্লা পুলিশ লাইন্স।  ওই রাতেই রেসকোর্সে এমপি আবদুল মালেক সাহেবের ভাইয়ের বাড়িটি মাইন দিয়ে গুড়িয়ে দেয়।’

এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘২৬ মার্চ সকালে রেসকোর্সের কবরস্থান এলাকায় আমরা বন্ধুরা একত্রিত হয়ে কি করা যায় চিন্তা ভাবনা করি। তখন শহর ছিল কারফিউ। যেহেতু কারফিউ ছিল তাই কোথায়ও গিয়ে যে নেতাদের সঙ্গে দেখা করে দিকনির্দেশনা পাব সে অবস্থাও ছিল না। ২৮ মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নিলে আমরা বন্ধুরা কুমিল্লা শহরের অবস্থা দেখার জন্য সারা শহর ঘুরে বেড়াই। তখন দেখি রানীর বাজারে হিন্দুদের যে মন্দিরটি আছে সেই মন্দিরের এক ঠাকুরের মরদেহ ড্রেনে পড়ে আছে। ছাতিপট্টি ও চকবাজার গিয়ে দেখি ওই এলাকার মিস্ত্রি দোকানের কয়েকজন মালিকের মরদেহ ড্রেনে পড়ে আছে। অনুমান করে মনে হলো ২৫ মার্চ রাতে কুমিল্লা শহরে কম করে হলেও ১৫-২০ জন মানুষকে তারা গুলি করে মেরেছে। দুটি ড্রেনে গুলিবিদ্ধ মরদেহ দেখে আমরা ভরকে যাই। তখন আর কোথায়ও না গিয়ে বাসায় চলে আসি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরই মধ্যে খবর পাই আমাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য ভারতে চলে গেছে। ৩০ মার্চ সকালে আমরা কয়েকজন মিলে রওয়ানা দিয়ে গোমতী নদী পার হয়ে ভারতের সোনামুড়া গিয়ে পৌঁছি বিকেলে। সেখানে গিয়ে প্রথমেই দেখা হয় বন্ধু মোগলটুলির কাজী দৌলত আহমেদ বাবুর সঙ্গে। ওই রাতে আমরা সোনাইমুড়ি নদীর একটি মাদরাসা ছিল সেখানে রাত কাটাই। এখানে এসে আমাদের নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান, অধ্যক্ষ আবদুর রউফ, অধ্যাপক খোরশেদ আলমদের সাক্ষাৎ পেতে আমাদের পাঁচ থেকে ছয় দিন সময় চলে যায়।’

প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে নাজিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমি প্রথম যুদ্ধ করি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার সীমান্তে। এটি সম্ভবত জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে।  কমান্ডার ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বে আমরা ৪০জন যোদ্ধা মিয়াবাজার গিয়ে অ্যামবুশ করি। অ্যামবুশের পরে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হই। আমাদের প্রস্তুতিটা ছিল এমন, প্রথম দলে ছিল ক্যাপ্টেন মাহবুবের নেতৃত্বাধীন, দ্বিতীয় সারিতে হাবিলদার কালামিয়ার নেতৃত্বাধীন এবং তৃতীয় সারিতে আমরা যারা এফএফ ছিলাম তারা। তারিখটা মনে নেই। সময়টা তখন সকাল হবে। পাক বাহিনীর দুটি জিপ যখন মিয়াবাজার সীমান্ত এলাকা দিয়ে যাচ্ছে তখন প্রথমেই তারা আমাদের অ্যামবুশে পড়ে। প্রথম গাড়িটি অ্যামবুশে পড়ার পর দ্বিতীয় গাড়িটি থামিয়ে ফায়ার করা শুরু করে। তখন আমরাও আমাদের কৌশলমত তীব্র পাল্টা আক্রমণ শুরু করি। এই যুদ্ধে হানাদার বাহিনীর চারজন নিহত ও কয়েকজন মারাত্মক আহত হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে যায়। তখন আমরা দ্রুত নির্ভয়পুর ক্যাম্পে চলে যাই। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে, আমাদের প্রথম যুদ্ধেই সফল হই এবং প্রথমবারের মত সেদিন শত্রুর বিরুদ্ধে আমি এসএলআর চালাই। পরে আমি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন সীমান্তে রেগুলার ফোর্সের সঙ্গে ৪/৫টি সক্রিয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।’

তিনি বলেন, ‘অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় হবে। গাইডের মাধ্যমে আমরা খবর পাই, গোমতী নদী নিয়ে নৌকায় করে দুজন পাক সেনা আমড়াতলী ক্যাম্পে যাচ্ছে। এমন সময় আমরা প্রস্তুতি নিয়ে কৌশলে তাদের আটক করি। এ সময় একজন অস্ত্র বের করতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে আমরা গুলি করে মেরে ফেলি। আর অপরজনকে হাত ও চোখ বেঁধে মতি নগরের সাব সেক্টর কমান্ডার দিদারুল আলমের কাছে পাঠিয়ে দেই। কিন্তু এই দুই সেনার হত্যার কারণে আমাদের চরম  মূল্য দিতে হয়েছে। এই অপারেশনের মাত্র দুদিন পরই পাকিস্তান বাহিনী এর প্রতিশোধ হিসেবে ইটাখোলা, আমড়াতলী ও ছাওয়ালপুর তিন দিক দিয়ে একসঙ্গেআক্রমন করে। এই অভিযানে তারা প্রায় এই তিন এলাকার প্রায় শতাধিক নিরিহ লোককে হত্যা করে । এর মধ্যে মহিলা ছিল প্রায় ২০  জন।’

মুক্তিযোদ্ধা মো. নিজাম উদ্দিন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘এই অভিযানটি এতই নির্মম ছিল যে, অভিযানের পর আমরা যখন  আসি তখন দেখি শিবেরবাজার এলাকার মাস্টার বাড়িতে ১০/১৫জন মহিলাকে হত্যা করে একটি মাটির ঘরে ঢুকিয়ে বাহির থেকে বন্ধ করে হানাদার বাহিনী চলে যায়। আমরা এসে ঘর খুলে দেখি, লাশের দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ঘরের পাশে গর্ত খুড়ে দাফন কাফন ও জানাজা ছাড়াই তাদের এক সঙ্গে মাটি চাপা দিয়ে দেই। যেই না আমরা একটি করে লাশ গর্তে ফেলছি এমন সময় দেখি মাত্র ছয় মাসের একটি শিশু আধা মরা অবস্থায় পড়ে আছে। আমাদের আওয়াজে চোখ খুলছে। সারা দেহে নানা পোকামাকড়। একজন সহকর্মী বলল, ভাই জীবন্ত এই শিশুকে কি করব। তখন আমরা কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারলাম না। কারণ, দুদিন আগে বয়ে যাওয়া হানাদার বাহিনীর ব্যাপক তাণ্ডবে পুরো গ্রাম জনমানব শূন্য। আশপাশে ডাক্তার নেই। মতিনগর ক্যাম্পে নিতে নিতে শিশুটিকে বাঁচানো যাবে না। আর সবচেয়ে বড় ভয় ছিল আমাদের আসার কথা শুনে যদি হানাদার বাহিনী আবার আক্রমণ করে তখন তো প্রতিরোধ করতে হবে। এই বলে ১০-১৫ জন নিহত নারীদের সঙ্গে শিশুটিকেও জীবন্ত মাটি চাপা দিয়ে আসি। হয়তো এই মহিলাদের কোনো একজন ছিল নিষ্পাপ শিশুটির মা। সেদিনের আমাদের বুক চাপড়িয়ে কান্নার আওয়াজ যে কত তীব্র ছিল একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানবে না।’

তিনি বলেন, ‘৮ ডিসেম্বর কুমিল্লা মুক্ত হয়। এ দিন আমরা আনন্দ মিছিল বের করি। এরপর বাড়ি যাই। বাড়ি গিয়ে দেখি, আমার চিন্তায় চিন্তায় বাবা-মা অসুস্থ হয়ে আছে।’ তখনকার স্মৃতিটাও অনেক আনন্দ বেদনার ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী জীবন কেমন ছিল জানতে চাইলে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘ভালোই আছি ইনশা আল্লাহ। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন সেই স্বপ্ন পূরন হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কিছুটা থেমে বলেন, হ্যাঁ, পূরণ হয়েছে। আমরা দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখছিলাম। দেশতো স্বাধীন হয়েছে।’

পরিচিতি

১৯৫৫ সালের ৫ মে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকায় এক সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ। তার বাবা মো. বশির উদ্দিন ও মা আজিজুন নেছা।

মুক্তিযুদ্ধ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত